Sunday, May 26, 2019

প্রতীক্ষা

তাবড় তাবড় রাজনৈতিক দল
আর জাঁদরেল নেতা,
উড়েছে ঘুম, কেটেছে বোল,
ছুটেছে তাদের কেতা।

ভোটের পরের এই কটা দিন
জন গনেশই রাজা,
কাটছে না দিন, বিনিদ্র রাত
নেতার এটাই সাজা।

গনতন্ত্রের কি মাহাত্ম্য,
বুঝছে রাজা আর আমাত্য
আজ প্রজারা সদাই হাস্য
প্রহর গুনছে রাজা।

ক্ষমতা দখল করবে যারা
জন গনেশের রায়ে,
গুছিয়ে নেবে আখের তাদের
রেখে গনেশ কে বাঁয়ে।

আমরা প্রজা, হদ্দ বোকা
ভোট দিতে যাই নেচে,
নেতা যেই হোন মুচকি হাসেন
দিব্বি থাকেন বেঁচে।

মরে গরিব গুরবো গুলো
উলুখাগড়া র দল,
ভোট মিটলেই রাজায় রাজায়
চল জলকে চল।

ছোট্ট ঘেরা একফালি ঘরে,
কোথায় যে কে বোতাম টিপে,
গন তন্ত্রের মহোৎসবে
প্রজা নিয়েছেন মেপে।

যিনিই বসুন মসনদেতে
জন মানসের ভোটে,
মিনতি মোদের করজোড়ে তে
সবার যেন ভাত জোটে।

হানাহানি নয়, শান্তি আসুক,
বেকার রা পাক কাজ
কৃষি বাঁচুক, শিল্প আসুক
আসুক ভরসা আজ।


~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ২০ মে, ২০১৯

উন্নাসিক

বলো কি চাই তোমার আজ
নেই চাইতে কোন লাজ
মন্ডা মিঠাই কোপ্তা পোলাও
নাই বা হল আজ
ভোট মিটলেই থালা ভরে
দেব তোমায় কাজ।

চাই শান্তি চাই চাকরি
চাই শিক্ষা চাই দীক্ষা
চাই শাসন নয় ভাষণ
চাই ভরসা পেলে আসন।

স্লগ ওভারে মাইক হাতে
আমরা এখন কল্পতরু
উঠছে গাছে গল্পের গরু
শেষের থেকে হচ্ছে শুরু
নটে গাছ তো মুড়োচ্ছে না।

চার বছরের ব্যবধানে
আবার আমরা ভোট দানে
অবাধ্যতায় অপমানে
লেপবো কালি আঙুলে।

আজ আমরা সবাই রাজা
ভাবছি সবাই কি আপন
কিন্তু আবার ভোট মিটলেই
যে যায় লঙ্কায় সেই রাবণ।

এবার একটু অন্যরকম
যেন সবই আনকমন
তুমি বন্ধু কোন মেরুতে
কোন ধর্মের সাতকাহন।

বাজার ওলা, সব্জিওলা
কিংবা চেনা রাজমিস্ত্রি টা
প্রান্তিক সেই মানুষ গুলো
কোন মেরুতে বল সেটা।

কি লাভ ভেবে এই ছাইপাঁশ
তার চেয়ে চল কাটিয়ে পাশ
ধান্দাবাজির কারবারে আজ
জমিয়ে মজা না থাক কাজ।

হতভাগার কপাল মোদের
খেলেছে নিয়ে রাজনীতিক
ইতিহাসে কি থাকবে লেখা
আমরা ছিলাম উন্নাসিক।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ১১ মে, ২০১৯


.........., জিতবো রে

হাজার ওয়াট আলোর নিচে
লক্ষ মানূষ করছে ভিড়
একটু দুরেই নিকশ কালোয়
ক্ষিদে চাপছে আমার বীর

রাসেল আজকে ম্যান অফ দা ম্যাচ
খেলা মোটে দুই কুড়ির
কুড়ি দিন তো পার করেছি
আসছে দিনের প্রস্তুতির।

লাইন দিয়ে টিকিট হাতে
মাথায় বেধে ফেট্টিটা
আমাদের প্রতিবাদের ভাষার
শোনাও না সেই ছন্দটা

ছোট্ট খোকা যাচ্ছে ইডেন
করতে বরণ ক্রিকেট বীর
না খাওয়া ওই মুখ গুলো সব
পাংশু মুখে লক্ষে স্থির।

হাজার ডেসিবেলের শব্দে
কাঁপছে আকাশ হাসছে মাঠ
নিঃশব্দে খিদে চেপে
প্রতিবাদীর চোয়াল কাঠ।

ঠিক জানা নেই কিসের জন্য
থমকে চাকরি মাঝপথে
রোদ, জল ঝড় মাথায় নিয়ে
রয়েছে পরে রাজপথে।

যতবার ভেসে আসছে হাওয়ায়
কোরবো লড়বো জিতবো রে
চোয়াল গুলো হচ্ছে কঠিন
মেয়ো রোডের ঠিক মোড়ে

রাজনীতি নয় সহানুভূতি
আর্জি হতে মানবিক
ওদের দাবী মানতে রাজি
বাধ্য হবেই যে দাম্ভিক।

অনুরোধ আজ সবার কাছে
মিটবে বাঁধা কাটিয়ে টেট
ফুটবে হাসি সবার মুখে
চাকরি প্রার্থী ভরবে পেট।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ২৪ শে মার্চ ২০১৯

দোলের স্মৃতি

পাড়ার কৃষ্ণচূড়া গাছটার মতন বছরের এই সময়টাতে সকলের মন রঙিন হয়। অবহেলায় বেড়ে ওঠা গাছটা প্রতি মুহূর্তে জানান দেয় এখনো বসন্ত আসে আমাদের এই পোড়া দেশে। স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই দূর থেকে ডেকে ওঠে বোকা কোকিলটা। ছেলেবেলায় পড়ার ফাঁকে আমরাও ওই কোকিলের স্বরে ডাকতাম আর বোকা কোকিলটাও সাড়া দিত আরো জোরে।

এখন পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া দেখতে শহুরে হুজুগে মানুষ ছুটে যান পুরুলিয়ার গ্রাম গুলোতে। দামী ক্যামেরা সাথে নিয়ে। ফেসবুকের দেওয়াল লাল হয়ে ওঠে পলাশের রঙে। মন কতটা রঙিন হয় জানিনা, তবে বেশ একটা দেখনদারি লক্ষ করা যায়।

আমাদের এই অঞ্চলে আগে অসংখ্য জুটমিল ছিল। ফলে দিন আনা দিন খাওয়া দেহাতি লোকের বাস ছিল। চটের বস্তার গায়ে যে রঙ দিয়ে লেখা হত, সেই রঙ এই সময়টাতে জুটমিলের দেহাতি লোকেদের হাত ঘুরে চলে আসতো আমাদের কাছে। ওনারা ওই রঙ কখনোই বিক্রি করতেন না। সকলের সাথে ভাগ করে নিতেন স্বেচ্ছায়। দোলের পরেও ওই বাঁদূরে পাকারঙ আমাদের গায়ে লেগে খাকতো কমপক্ষে দিন পাঁচেক। আর হাতের চেটোতে কমপক্ষে পনেরোদিন। জুটমিলে শ্রমিক দের মধ্যে দেহাতি লোক ছাড়াও বেশ কিছু উড়িয়া লোকও ছিলেন তারাও দোল উৎসব পালন করতেন যত্নে তাদের উড়িয়া পট্টিতে। ওখানের গানের সুর ও তাল টাও বেশ মজার ছিল। বিকাল বেলা পালকি করে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ নিয়ে বেরোতেন ওরা। আনন্দময় হয়ে উঠত চারপাশ। সাধারন মানুষ সাধারন ছিলেন। খুব ছোট ছোট কাজেও সবাই আনন্দে মেতে উঠতেন।

দোল তখনো এতটা হোলি হয়ে যায় নি। পাড়ার হরিসভায় হরিনাম সংকীর্তন হত অষ্টপ্রহর। এখনো এটা বজায় আছে তবে জাঁকজমক কমেছে অনেক। দোলের পরে সাতদিন ধরে কীর্তন গান হত আর শেষের দুদিন যাত্রাপালা হত। প্রথমদিন কোলকাতা থেকে যাত্রাদল আসতো আর শেষদিন পাড়ার লোকেরা মিলেই যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করতেন। আমরা ছোটরা সাজঘরে উকি দিতাম। অতি সাধাসিধে মানুষ কি রকম ভাবে ভয়ংকর রাবন রাজায় সেজে উঠতেন দেখতাম অবাক চোখে। আসলে তখন তো ঘরে ঘরে টিভি ছিল না। সাজঘরে উকি দিয়েই একবার সীতাকে বিড়ি খেতে দেখেছিলাম। বিস্ময়টা ছিল মনের ভিতর বহুদিন।

দোলপূর্নিমার আগে র রাতে গঙ্গা থেকে জল সয়ে এসে শুরু হত হরিনাম গান। গঙ্গার ওপার থেকে দেখা যেত উত্তরপাড়ার দোল তলার আতশবাজি পোড়ানো।একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। পাড়ার হরিসভা থেকে প্রথম প্রথম গানের আওয়াজ পাওয়া গেলেও একটু রাত বাড়লে শুধুই শ্রীখোল আর খঞ্জনির আওয়াজ ভেসে আসতো কানে। চাঁদের আলোয় ভেসে যেত ঘর। আর তার সাথে মাঝে মাঝে শ্রীরাধা গোবিন্দ জয়ো ধ্বনি। একরাশ মায়া তৈরি হত মনের কোনে।

এই সময়টাতে, বেশ কিছুদিন ধরে ঝরে যাওয়া পাতা গুলো সংগ্রহ করে রাখতাম আমরা। সাথে ফেলে দেওয়া মিস্টির হাড়ি। নারকেল গাছের পাতা ও সুপুরি পাতার কদর ছিল সবথেকে বেশি।  ইস্কুল থেকে ফেরার পথে যে যেমন পারতো শুকনো পাতা জড়ো করতাম আমরা ন্যাড়াপোড়ার জন্য। আর বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হত আলু। আলুপোড়া খাওয়া হত খুব মজা করে। এখন এই শহরতলি তেও খুব একটা দেখতে পাই না। তবে কিছু কিছু জায়গায় এখনো হয় বলে শুনি। আমরা চ্যাঁচোর বলতাম।

এই দোল উৎসবের মধ্যে একটা সাম্যবাদ দেখতে পাই। আগের দিনের বাঁদূরে রঙ বা এখনকার সময়ের ভেষজ আবিরে রঙিন হওয়ার পর পাড়ার ডাকসাইটে দাদা ও সাইকেলের দোকানের মেকানিক সবাই সমান।  বেলা বাড়ার সাথে সাথে সবার গায়ের জামাই ইলেক্ট্রিকের তারে। ফ্যাকাসে রাস্তাতেও তখন রঙের কারুকাজ।

দোলের সকাল বেলা টা শুরু হত, বাড়ির গুরুজন দের পায়ে ফাগ দিয়ে। জলখাবার খেয়ে স্থানীয় বন্ধুরা মিলে আমরা রঙ খেলতাম। হ্যা সেই বাঁদূরে রঙ দিয়ে। আমরা কখনোই দেখার সুযোগ পাই নি যে রঙ মাখার পর আমাদের এই চাঁদ বদনটাকে কি রকম দেখায়। তবে রঙ খেলে বাড়ি ফিরলে প্রতি বছরই মা বলতো নাকি ভুতের মতন লাগছে।

এখন দোল খেলার থেকেও বিভিন্ন বিভঙ্গে নিজের ছবি তোলার হিরিক লক্ষ করি। নিজের ফেসবুকের দেওয়ালে ওই ছবি সাঁটানো না অব্ধি কারো যেন শান্তি নেই। তারপর পছন্দ হোক বা না হোক লাইকের কাউন্টিং। শো অফ টা বড্ড চোখে লাগে।

এই বিশেষ সময়ে বাজারে আসে বিভিন্ন রঙের মঠ ও ফুটকড়াই ও মুড়কি। আমাদের ছেলেবেলায় দোলের পরে রঙিন মঠ লেবুর জলে গুলে খাওয়ার মজা এখনকার প্রজন্ম ভাবতেই পারবে না। হ্যা অবশ্যই কাঁচের গ্লাসে।আসলে এখনকার এই চুড়ান্ত বিশ্বায়নের জুগে সব ভীষন সহজলভ্য।

মানুষের মন অনেক বেশি রঙিন ছিল। ভরসা ছিল, বিশ্বাস ছিল পাকা রঙের মতন গাঢ়। তাই সেই রঙ টাকে ফলাও করে বাহ্যিক করে তুলতে হত না। এখন এই সমাজের অন্তরের রঙ এতটাই ফ্যাকাসে, যে 'লাগে মাস্কারা দু চোখ আঁকতে। ক্লান্তির কালো রঙ কে ঢাকতে'।
সবাই দেওয়াল ভরিয়ে তুলে জানান দিতে চায় দেখ 'কি সুখে রয়েছি আমি'।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ২১ শে মার্চ ২০১৯

Tuesday, February 26, 2019

আজ তোমার সাথে আড়ি

মেহেদী হাসান, গুলাম আলি
আজ তুমি সন্ত্রাসী
কাল তোমার সাথে ভাব
আজ আমি বড্ড আগ্রাসী।

তোমার সেই স্বপ্নের স্পেল
মন্ত্রমুগ্ধ পরাক্রম
তোমার বোলিং দেখব না আর
ওয়াসিম আক্রম।

কাল তুমি ছিলে শান্তি মিছিল
উগ্র দেশপ্রেমে
আজ মাতলে উল্লাসে
রাজপথে নেমে।

মোমবাতিটার নেই তো দেশ
কাল সীমানার গন্ডী
কাল জ্বলেছে সীমান্তে
আর আজ উগ্রচণ্ডী।

কত সন্ত্রাসী মরলো যে আজ
যুদ্ধ বিমান হানায়
মিরাজ কি সে চিনতে পারে
না কি তাকে কেউ চেনায়।

মধ্যবিত্ত আমরা বাঁচি
দিন গুজরান মায়ায়
মানুষ যারা মরল যে আজ
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়।

তুমি মারবে পঞ্চাশ
আর আমি মারবো দুশোয়
রাজনীতিবিদ ঠাঁই পেয়ে যাবে
মোমের মাদাম তুসোয়।

নিলাম বদলা এক পশলা
হঠাৎ শিলা বৃস্টি
এপারে আজ কালবৈশাখী
ওপারে গোলাবৃস্টি।

দোহাই তোমায় দিব্যি বলছি
করিনা রাজনীতি
হঠাত রাতে ঘুম ভেঙে যায়
গণহত্যায় ভীতি।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

Thursday, February 14, 2019

ভালোবাসার দিনে

যাচ্ছে হয়ে হন্তদন্ত সদ্য শাড়ী
সাথে হলুদ পাঞ্জাবী হালকা দাড়ি
থাকুক ভাল, রাখুক ভাল এই আকালে
ভালবাসার উদযাপনের এই সকালে।

ক্লাস নাইনের মিষ্টি নিতাও ভালোবাসে
কিডনি রোগে রুগ্ন বাবার সত্তাটাকে
তার কাছেও উদযাপন এই ভ্যালেন্টাইন
ডায়ালিসিস শেষে বাবার নেইকো টাইম।

আর হায়দার বস্তির ওই ঘুপচি ঘরে
ছোট্ট মিনার একফালি হাত আঁকড়ে ধরে।
কেউ নেই ওর এই দুনিয়ায় মিনা ছাড়া
ভ্যালেন্টাইন বুড়োর চোখে জলের ধারা।

লিখুক ছাপুক আর্চিও তার গ্রিটিংস কার্ডে
মানুষ কেমন এই আকালেও স্বপ্ন দেখে।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯

Thursday, December 6, 2018

ছেলেবেলার শীত

আমাদের এখানে হেমন্ত কখন যে আসে ঠিক টের পাওয়া যায় না। দুগগা ঠাকুর বা কালি ঠাকুর জলে পড়লেই গা ছ্যাঁত ছ্যাঁত করতো।  ছেলেবেলায়, পুজোর রেশ মিটতেই মা কাকিমারা যখন আলমারি থেকে উল কাঁটা বের করতেন, তখন বোঝা যেত আর কিছু দিন বাদেই শীত আসছে। গ্রাফ পেপারে রকমারি ডিজাইন এঁকে সেগুলো অনায়াস দক্ষতায় দুটোমাত্র কাঁটার সাহায্যে রঙিন উল দিয়ে ফুটিয়ে তুলতেন বাড়ীর মা কাকিমারা। বাড়িতেই তৈরি হত সোয়েটার, মাফলার, টুপি, মোজা, গ্লাভস আরো কত কি।

দু তিন দিন অন্তর বুকের ছাতির মাপ নেওয়া হত। সাথে গলা ও পিঠেরও। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কবে বোনা শেষ হবে। আর পরদিনেই ইস্কুলে পরে যাব সেটা।

ইস্কুলে গিয়েও বন্ধুর মায়েরা কাছে ডেকে নিতেন নতুন ডিজাইন গুলো নিজেরা তুলে নিতে।

অনেকের বাড়িতে কুরুশের কাজও করা হত। এখন আর সেসব খুব একটা দেখতে পাই না। ছেলেবেলায় পুরানো সোয়েটার, যেগুলো ছোট হয়ে গেছে, তা থেকে উল খুলে নিয়ে বড় বড় উলের গোলা বানাতাম আমরা। সে এক বড় মজার ব্যাপার ছিল। সেই খোলা উল দিয়ে আবার তৈরি হত নতুন সোয়েটার, নতুন ডিজাইনের।

সত্যজিৎ বাবুর সিনেমায় এখনো দেখা যায় বাড়ির মহিলা দের উলের সোয়েটার বানানোর ছবি। সেলুলয়েডেই সাক্ষী থেকে গেছে।

কোন সান্টাক্লজ আমাদের ছেলেবেলায় শীত বয়ে আনতেন না। শীত বয়ে নিয়ে আসতেন জয়নগরের মোয়াওলা মাথার ডালা ভরে। ভরা দুপুরে হেঁকে যেতেন সুরেলা গলায়, জয়নগরের মোয়া, নলেন পাটালি গুড়।

কেক খাওয়ার রেওয়াজ বরাদ্দ ছিল বছরে একদিনই, বড়দিনে। অবধারিত ভাবে চলে আসত বড়ুয়া বেকারি। পেস্ট্রি খাওয়ার চল হয়েছে অনেক অনেক পরে।

আখের রসের গাড়ি ছিল, কিন্ত আমরা তার থেকেও বেশি মজা পেতাম দাঁত দিয়ে ছাড়িয়ে খেতে। মুখ ছড়ে গেলেও এর মজা ছিল ঢের বেশি। শীতের দুপুরের নরম রোদ্দুর পিঠে মেখে আখ খেতেও এখন আর খুব একটা কাউকে দেখি না।

ভরা শীতে সব পাড়া ম ম করতো নলেন গুড়, পাটালির গন্ধে। পিঠে, পুলি, পাটিসাপটা, রসবড়া আরো কত কি। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়। এখন তো প্রায় সবই দোকানে বিক্রি হয়।

রবিবারের সকালে ধপধপে সাদা ফুলকো লুচি দিয়ে পয়রা গুড় খাওয়ার জন্যই আবার এখানে জন্মানোর ইচ্ছে জাগে মনে। অমৃতের স্বাদ কি রকম জানি না তবে সেটা নিশ্চিত এর থেকে ভাল হতেই পারে না।

শীতে ফি বছর সার্কাস ময়দানে আসতো অলিম্পিক সার্কাস। কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে অবাক বিস্ময়ে দেখতাম ট্রাপিজের খেলা। হাসিতে ভরিয়ে তুলতেন জোকার কাকুরা। অর্কেস্ট্রা বাজতো সার্কাসে। হ্যা ঠিকই পড়লেন, অর্কেস্ট্রা বাজতো। এখন তো প্রিরেকর্ড করা বাজনা বাজে। হাতি, বাঘ, সিংহ, জলহস্তীরাও ছিল সার্কাসের অঙ্গ। সেসব হারিয়েছে বহুদিন হল।

শীত পরলেই মনে পরে আমাদের পাড়ার মাঠে পুতুল নাচের আসর বসতো। তারা আসতো রকমারি পালা নিয়ে। প্রচার হত রিক্সা গাড়িতে চোঙা লাগিয়ে ও সাথে হাতে আঁকা পোস্টার। মাঠে চট বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা থাকতো। চলতো প্রায় দিন পনেরো। ভারি মজার ছিল সেই সময় গুলো।

আসতেন এক সাইকেল চালক দাদা। দিন সাতেকের জন্য। অবিরাম সাইকেল চালিয়ে যেতেন তিনি। মোটেই নামতেন না সাইকেল থেকে। গোল হয়ে ঘুরতেন মাঠ জুড়ে। দু এক দিনের মধ্যেই পাড়ার একজন হয়ে উঠতেন তিনি। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকতাম তার কুশলতা দেখে। আমাদের ছেলেবেলার হিরো হয়ে উঠতেন অল্পদিনেই। গায়ে পুরানো টিউব লাইট ভাঙতেন। আর শেষ দিনে মাটির নিচে কবরে যেতেন। অনেকক্ষন মাটির নিচে থাকতেন। সে সময় কেউ একটাও কথা বলতো না।পরে বের করে আনা হত অচৈতন্য অবস্থায়। সুস্থ করা হত দুধ রুটি দিয়ে। একাজে এগিয়ে আসতেন পাড়ার প্রায় সব মহিলারাই।

শীত মানেই কাঁধে গাঁটরি নিয়ে হাজির হতেন কাশ্মীরি শাল ওলা। যাদের সামর্থ্য ছিল, তারা কিনতেন। আমাদের কখনো কেনা হয়ে ওঠেনি।

যখন আমরা খুব ছোট, তখন একবার শহরে এসেছিল রাশিয়ান সার্কাস। এক্কেবারে অরিজিনাল। খুব সম্ভবত নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। ঠিক মনে নেই। অনেক বন্ধুরা গিয়ে দেখে এসেছিল।

শীত মানেই অবধারিত ভাবে চলে আসে, কফি খাওয়ার কথা। ভেতো বাঙালির কফি বিলাস। সাধ পুরন করতো নেসক্যাফে।

ইডেন গার্ডেনে ক্রিকেট খেলাটা তখন শীতেই হত শুধুমাত্র। সারা বছর জুড়ে ক্রিকেট খেলার চল ছিল না সে সময়। নরম রোদ গায়ে মেখে টেস্ট ক্রিকেট দেখার মাহাত্য এখন হারিয়েছে অনেকটাই।

তবে এখনো শীত আসে এ শহরে। অন্যভাবে। বেশিরভাগ ছেলেবেলার মজাই হারিয়ে গেছে চিরতরে। বয়স বাড়ছে। অল্পেই শীত ধরে এখন।

সৌমিক মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ৪, ২০১৮। মঙ্গলবার

দুঃসময়

সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? সন্ত্রাসে মরে সেনা মন্ত্রীরা করে হায় হায়। সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? মৃত সেনার ছবি খবরের পাতায় পাতায়। ...