Thursday, December 6, 2018

ছেলেবেলার শীত

আমাদের এখানে হেমন্ত কখন যে আসে ঠিক টের পাওয়া যায় না। দুগগা ঠাকুর বা কালি ঠাকুর জলে পড়লেই গা ছ্যাঁত ছ্যাঁত করতো।  ছেলেবেলায়, পুজোর রেশ মিটতেই মা কাকিমারা যখন আলমারি থেকে উল কাঁটা বের করতেন, তখন বোঝা যেত আর কিছু দিন বাদেই শীত আসছে। গ্রাফ পেপারে রকমারি ডিজাইন এঁকে সেগুলো অনায়াস দক্ষতায় দুটোমাত্র কাঁটার সাহায্যে রঙিন উল দিয়ে ফুটিয়ে তুলতেন বাড়ীর মা কাকিমারা। বাড়িতেই তৈরি হত সোয়েটার, মাফলার, টুপি, মোজা, গ্লাভস আরো কত কি।

দু তিন দিন অন্তর বুকের ছাতির মাপ নেওয়া হত। সাথে গলা ও পিঠেরও। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কবে বোনা শেষ হবে। আর পরদিনেই ইস্কুলে পরে যাব সেটা।

ইস্কুলে গিয়েও বন্ধুর মায়েরা কাছে ডেকে নিতেন নতুন ডিজাইন গুলো নিজেরা তুলে নিতে।

অনেকের বাড়িতে কুরুশের কাজও করা হত। এখন আর সেসব খুব একটা দেখতে পাই না। ছেলেবেলায় পুরানো সোয়েটার, যেগুলো ছোট হয়ে গেছে, তা থেকে উল খুলে নিয়ে বড় বড় উলের গোলা বানাতাম আমরা। সে এক বড় মজার ব্যাপার ছিল। সেই খোলা উল দিয়ে আবার তৈরি হত নতুন সোয়েটার, নতুন ডিজাইনের।

সত্যজিৎ বাবুর সিনেমায় এখনো দেখা যায় বাড়ির মহিলা দের উলের সোয়েটার বানানোর ছবি। সেলুলয়েডেই সাক্ষী থেকে গেছে।

কোন সান্টাক্লজ আমাদের ছেলেবেলায় শীত বয়ে আনতেন না। শীত বয়ে নিয়ে আসতেন জয়নগরের মোয়াওলা মাথার ডালা ভরে। ভরা দুপুরে হেঁকে যেতেন সুরেলা গলায়, জয়নগরের মোয়া, নলেন পাটালি গুড়।

কেক খাওয়ার রেওয়াজ বরাদ্দ ছিল বছরে একদিনই, বড়দিনে। অবধারিত ভাবে চলে আসত বড়ুয়া বেকারি। পেস্ট্রি খাওয়ার চল হয়েছে অনেক অনেক পরে।

আখের রসের গাড়ি ছিল, কিন্ত আমরা তার থেকেও বেশি মজা পেতাম দাঁত দিয়ে ছাড়িয়ে খেতে। মুখ ছড়ে গেলেও এর মজা ছিল ঢের বেশি। শীতের দুপুরের নরম রোদ্দুর পিঠে মেখে আখ খেতেও এখন আর খুব একটা কাউকে দেখি না।

ভরা শীতে সব পাড়া ম ম করতো নলেন গুড়, পাটালির গন্ধে। পিঠে, পুলি, পাটিসাপটা, রসবড়া আরো কত কি। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়। এখন তো প্রায় সবই দোকানে বিক্রি হয়।

রবিবারের সকালে ধপধপে সাদা ফুলকো লুচি দিয়ে পয়রা গুড় খাওয়ার জন্যই আবার এখানে জন্মানোর ইচ্ছে জাগে মনে। অমৃতের স্বাদ কি রকম জানি না তবে সেটা নিশ্চিত এর থেকে ভাল হতেই পারে না।

শীতে ফি বছর সার্কাস ময়দানে আসতো অলিম্পিক সার্কাস। কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে অবাক বিস্ময়ে দেখতাম ট্রাপিজের খেলা। হাসিতে ভরিয়ে তুলতেন জোকার কাকুরা। অর্কেস্ট্রা বাজতো সার্কাসে। হ্যা ঠিকই পড়লেন, অর্কেস্ট্রা বাজতো। এখন তো প্রিরেকর্ড করা বাজনা বাজে। হাতি, বাঘ, সিংহ, জলহস্তীরাও ছিল সার্কাসের অঙ্গ। সেসব হারিয়েছে বহুদিন হল।

শীত পরলেই মনে পরে আমাদের পাড়ার মাঠে পুতুল নাচের আসর বসতো। তারা আসতো রকমারি পালা নিয়ে। প্রচার হত রিক্সা গাড়িতে চোঙা লাগিয়ে ও সাথে হাতে আঁকা পোস্টার। মাঠে চট বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা থাকতো। চলতো প্রায় দিন পনেরো। ভারি মজার ছিল সেই সময় গুলো।

আসতেন এক সাইকেল চালক দাদা। দিন সাতেকের জন্য। অবিরাম সাইকেল চালিয়ে যেতেন তিনি। মোটেই নামতেন না সাইকেল থেকে। গোল হয়ে ঘুরতেন মাঠ জুড়ে। দু এক দিনের মধ্যেই পাড়ার একজন হয়ে উঠতেন তিনি। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকতাম তার কুশলতা দেখে। আমাদের ছেলেবেলার হিরো হয়ে উঠতেন অল্পদিনেই। গায়ে পুরানো টিউব লাইট ভাঙতেন। আর শেষ দিনে মাটির নিচে কবরে যেতেন। অনেকক্ষন মাটির নিচে থাকতেন। সে সময় কেউ একটাও কথা বলতো না।পরে বের করে আনা হত অচৈতন্য অবস্থায়। সুস্থ করা হত দুধ রুটি দিয়ে। একাজে এগিয়ে আসতেন পাড়ার প্রায় সব মহিলারাই।

শীত মানেই কাঁধে গাঁটরি নিয়ে হাজির হতেন কাশ্মীরি শাল ওলা। যাদের সামর্থ্য ছিল, তারা কিনতেন। আমাদের কখনো কেনা হয়ে ওঠেনি।

যখন আমরা খুব ছোট, তখন একবার শহরে এসেছিল রাশিয়ান সার্কাস। এক্কেবারে অরিজিনাল। খুব সম্ভবত নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। ঠিক মনে নেই। অনেক বন্ধুরা গিয়ে দেখে এসেছিল।

শীত মানেই অবধারিত ভাবে চলে আসে, কফি খাওয়ার কথা। ভেতো বাঙালির কফি বিলাস। সাধ পুরন করতো নেসক্যাফে।

ইডেন গার্ডেনে ক্রিকেট খেলাটা তখন শীতেই হত শুধুমাত্র। সারা বছর জুড়ে ক্রিকেট খেলার চল ছিল না সে সময়। নরম রোদ গায়ে মেখে টেস্ট ক্রিকেট দেখার মাহাত্য এখন হারিয়েছে অনেকটাই।

তবে এখনো শীত আসে এ শহরে। অন্যভাবে। বেশিরভাগ ছেলেবেলার মজাই হারিয়ে গেছে চিরতরে। বয়স বাড়ছে। অল্পেই শীত ধরে এখন।

সৌমিক মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ৪, ২০১৮। মঙ্গলবার

Sunday, September 30, 2018

অনুরোধ

২০১০ সালের আজকের দিনেই BIFR এ চলে গেছিল এই সংস্থাটি। শেষের শুরু আজকের এই দিন টা থেকেই।

দেখতে দেখতে অনেক গুলো বছর পেরিয়ে গেলো। ছবি গুলো আজও চোখের সামনে ভেসে আসে। পুজোর আগে বিশ্বকর্মা পুজোর জাঁকজমক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বোনাস পেয়ে শ্রমিক কর্মচারী দের আনন্দচ্ছল মুখ। সব কেমন যেন হারিয়ে গেলো।

আরিয়াদহ, কামারহাটি, দক্ষিণেশ্বর অঞ্চলে ইন্ডিয়া ফয়েলস লিমিটেড এর কথা বলছি। এলাকায় বয়স্ক জনেরা ভেনেস্তা নামেই এখনো অনেকে ডাকেন। যদিও এই নামকরন ১৯০৫ সালের। শেষমেশ নাম বদল হয়ে হল এস ডি এলুমিনিয়াম।

এলুমিনিয়াম ফয়েল প্রস্তুতকারক এই সংস্থা আমাদের অঞ্চলের একটা ল্যান্ডমার্ক ছিল। ব্রিটিশ আমলের এই কোম্পানি তে কাজ করার স্বপ্ন দেখতো শিক্ষিত মানুষজন। জীবিকার্জনের জন্য এলাকায় প্রসিদ্ধি ছিল এই সংস্থার।

পরবর্তী সময়ে খৈতান গোষ্ঠী যথেষ্ট সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন এই সংস্থাকে। এ সবই এখন ইতিহাস।

ভীষন ভীষন খারাপ লাগে যখন দেখি এই রকম নামী একটা কোম্পানি চোখের সামনে ধংস্ব হয়ে গেল। ভুল বললাম নস্ট করে দেওয়া হল। ম্যানেজমেন্ট ভুল, নাকি শ্রমিকদের দিশাহীনতা, নাকি অন্য কিছু তা জানি না। তবে ভিতরে ভিতরে রক্তাক্ত হই বন্ধুস্থানীয়দের দেখে। যারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন।

শুনতে পাই বকেয়া টাকা, গ্রাচুইটির টাকা, পিএফ এর জমানো টাকা কিছুই এনারা পান নি। কবে পাবেন তাও বোধহয় কেউ জানেন না। গা শিঊরে ওঠে। মাইনে পেয়েও যেখানে এই দুর্মুল্যের বাজারে সংসার চালানো কস্টকর, সেখানে এনাদের চলে কি করে। অনেককেই দেখি বিকল্প কাজের সন্ধান করতে।

খুব খারাপ লেগেছিল দেখে যে এনারা কেনো কোনো আন্দোলনে গেলেন না। রথতলার মোড়ে কিছুদিন লিফলেট বিলি করে, কিছুদিন মাত্র অবস্থান করে, ধর্মতলায় লিফলেট বিলি করে কেন এনারা ক্ষান্ত হলেন? নিজেদের কথা আরো বৃহত্তর পরিমন্ডলে ছড়িয়ে দিলেন না কেন? কেন মাত্র এক দু দিন বাজারী কাগজে ছাপা হল এনাদের দুর্দশার কথা। যেখানে শিল্প বন্ধের জন্যে দীর্ঘ দিন অবস্থান বিক্ষোভ হয়, সেখানে জলজ্যান্ত একটা কারখানা এভাবে কেন বন্ধ হয়ে গেলো? আরো তেজদ্বীপ্ত হওয়া যেত না কি?

জানি প্রশ্ন গুলো সহজ।
কিন্তু আমার কাছে উত্তর জানা নেই। কারোকাছে থাকলে জানাবেন।

যারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তাদের কাছে আমার বিনম্র অনুরোধ, একটু মানবিকতা দেখান। কারখানার গেটে নরনারায়ন সেবার মতন খাবার ব্যবস্থা না করে, সম্মানের সাথে মাথা তুলে বাঁচতে সাহায্য করুন কর্মচারীদের। ভবিষ্যতে কারখানা খোলার সম্ভবনা যদি একান্ত নাও থাকে, এনাদের প্রাপ্য বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাটা অন্তত করুন।

সব্বাই ভাল থাকলে, তবেই আমরা সকলে ভাল থাকব।
পুজো আসছে, রাস্তায় রাস্তায় আলো লাগছে। কিন্তু এত আলোতেও, এলাকার কর্মহীন  মানুষের মনের অন্ধকার দূর হবে কি?

পরিশেষে বলি ইন্ডিয়া ফয়েলস ছাড়াও অন্যান্য অনেক কারখানা আজ এই এলাকায় বন্ধ হয়ে আছে। আর্থ সামাজিক অবস্থা ভয়াবহ। অনুরোধ কোন রাজনীতি খুঁজবেন না এই লেখায়। যদি কিছু মাত্র ভুল বলে থাকি, তবে ভুল টা শুধরে দেবেন এই আশা রাখি।


সৌমিক মুখোপাধ্যায়
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮।

Saturday, September 1, 2018

গন্ধ

অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে দিনুকে শুধুমাত্র তার ওই বোঁচা চ্যাপ্টা নাক টার জন্য। ছেলেবেলায় মা ঠাকুমা অনেক চেষ্টা করেছিলেন, যদি নিয়মিত তেল মালিশ করে নাক টাকে কিছুটাও লম্বা করা যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছুটি হয় নি।

ইস্কুলে পড়ার সময় বন্ধুরা কেবল হাসাহাসি করত। পাড়ার মেয়েরাও আড়ালে তাকে দেখে হাসত। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকত দিনু। শুধুমাত্র ওর এই  খ্যাঁদা নাকটার জন্য।

কারো বিষয়ে কারনে অকারনে কখনোই নাক গলাতো না দিনু। নাকই নেই, কাজেই তা গলানোর প্রশ্নও নেই। সেদিক থেকে সে ছিল নিশ্চিন্ত।

তবে, ছেলেবেলায় মায়ের গায়ের গন্ধটা কিন্তু আজো নাকে লেগে আছে। মমতা মাখা উনুনের ধোঁয়া লেগে থাকা অদ্ভুত এক গন্ধ। মাকে হারিয়েছে সেই কোন কালে, বাবাকে তো চোখেই দেখেনি। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে সেই গন্ধটা পায় দিনু। বিশেষ করে খুব ভোর বেলায়। মা ফিরে ফিরে আসে সেই গন্ধটার মধ্যে দিয়ে।

ভাত ফোটানোর গন্ধ, তেলেভাজার দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাকে ভেসে আসা গন্ধ, সদ্যজাত রসগোল্লার গন্ধ, রোল কাউন্টার থেকে ভেসে আসা ডিম ভাজার গন্ধ শুঁকেই পেট ফুলে ওঠে দিনুর। কেনার তো আর পয়সা নেই। ভাঁড়ে মা ভবানি।

গ্রীষ্ম কালে মাটি তেতে ওঠার গন্ধ, বিষ্টির পর মাটির সোঁদাসোঁদা গন্ধ, দুগগা পুজোর ঠিক পরে পরেই ছাতিম ফুলের গন্ধ, শীতকালে সোয়েটারের গন্ধ প্রতিটাই ভীষন রকম আলাদা। প্রতিটাই খুব মায়াবি। কালজয়ী।

চল্লিশ পেরোল গত জুনে। কিন্তু এখনো নাকে লেগে আছে রেশন দোকানের পত্রালি খাতার গন্ধ। গম ভাঙানোর গন্ধ। হঠাত করে নাকে আসা কোন ধুপের গন্ধে মনটা আকুলি বিকুলি করে ওঠে। আর সেই অগরুর গন্ধটা যেটা মায়ের শরীরের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল খাটে তোলার পর। অসহ্য অতি অসহ্য সেই গন্ধ।

এখন দিনরাত চায়ের দোকানেই কাটে দিনুর। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেরা ঢিল ছুড়ে মারে, রাগায়, ভেঙায়।

ইদানীং পাড়ার আস্তাকুঁড়ের খাবারে ছেলেবেলার গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করে দিনু রোজ। কোন খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়ালে গায়ে জল ছিটিয়ে তাড়িয়ে দেয় লোকে। যদিও তাতে দিনুর কিছুটা পেট ভরে। সর্দি হলেই তার যত কষ্ট।

অগাস্ট ২৮, ২০১৮। মঙ্গলবার।

পার করেগা...

অনেক শ্রাবন দেখলাম এই জীবনে। ছেলেবেলায় শ্রাবন বলতে ছিল সারা মাস জুড়ে  বাইশ তারিখের প্রস্তুতি। সকলের আদরের, প্রানের ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। গান, কবিতা, নাটক এই সব নিয়ে আট থেকে আশির মেতে থাকা। পাড়ায় পাড়ায় ছোট ছোট মঞ্চ তৈরি করে শ্রদ্ধা জানানো।

ইদানীং শ্রাবন এলেই পথ চলতি সাধারন মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। বিশেষ করে শনিবার সন্ধ্যের পর থেকেই রাজপথ চলে যেতে থাকে ভক্তদের হাতে। হঠাৎ করে মানুষের মধ্যে এত ভক্তি ভাব এল কোথা থেকে এই ভাবনা মনে চলে আসে বারবার।

এইসব ভক্তদের উতসাহিত করার জন্য পথের ধারে সারি সারি মনোরঞ্জন এর পসরা। অঢেল খাবারের আয়োজন।

আফশোস হয়, যারা এই খাবার এর আয়োজন করেন, তারা পালা করে সারা বছর ধরে যদি এই প্রচেষ্টা চালান, তাহলে গরীব মানুষ গুলো দুমুঠো খেতে পারে।

প্রশাসক যিনিই হোন, ধর্মকে ঘাঁটাতে কেউই সাহস পান না। তাই এদের বাড়বাড়ন্ত বেড়েই চলে। কি অসম্ভব এনার্জি লেভেল। তারিফ না করে পারা যায় না। কিন্তু সবটাই বাবার মাথায় ঢেলে শেষ হয়ে যায়।

তারস্বরে মাইকে বাবার জয়গান, সাথে মজুত সব রকমের বাবার প্রসাদ। বাচ্চা থেকে মাঝবয়সী সবাই প্রসাদ প্রার্থী। কাঁধে বাঁক। মুখ ভরতি লালথুতু যা মাঝে মাঝে ভরিয়ে দিচ্ছে রাজপথ। রাস্তা জুড়ে প্লাস্টিকের গ্লাস, কাপ, শালপাতার ঠোঙা।

এ কোন পথে চলেছে কোলকাতা? বাংলাভাষী সাধারন মানুষজন নিজেদের সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে মেতে উঠছে অন্য রাজ্যের সংস্কৃতি নিয়ে।

এ এক নতুন কালচার।
এক নতুন রাজনীতি।
এক নতুন ভীতি।
এক নতুন দুঃসময়।

১২ আগস্ট, ২০১৮। রোববার।

Monday, August 6, 2018

বন্ধু

আজ বন্ধুত্বের বিশেষ দিনে তোকে বড্ড মনে পড়ছে রে।

ইস্কুলের দিন গুলোতে চুটিয়ে ক্রিকেট ফুটবল খেলা। মিলনী মাঠের রাধাচূড়া গাছটার নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়া। ছুটির দিন গুলোতে অন্য ক্লাবের ছেলেদের সাথে ক্রিকেট ম্যাচ, ক্লাবের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ব্যান্ড বাজাতে যাওয়া। বেশ ছিল দিন গুলো। মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা।

সময়ের নিয়মে আমরা সবাই আস্তে আস্তে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। দেখা সাক্ষাৎ কমে গেছিল। তবে যেখানেই দেখা হোক তোর হাসি মুখটা দেখলেই এক লহমায় মনটা ভাল হয়ে যেত।

অনেক পরে আমরা বন্ধুরা বুঝেছিলাম তুই খুব খুব ভাল অভিনেতা ছিলিস। চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি মনের কষ্ট ঢেকে ওরকম হাসির অভিনয় জগতের কোন অভিনেতা করতে পারবেন না।

যখন তোকে আর জি কর হাসপাতালে ভরতি করানো হল, তখনো মুখের হাসিটা একই রকম ছিল। অত্যন্ত সাবলীল সেই হাসি। জীবন টাকে খেলাচ্ছলে নিয়েছিলিস তুই।

অনেক বছর পর আমাদের ইস্কুলের বন্ধুদের আবার একটা প্ল্যাটফর্ম এ এনে দিয়েছিলিস। উপলক্ষ ছিলিস তুই।

তারপর মাঝে কয়েকটা দিন্র সুস্থতার অভিনয়। এখন ভারি অদ্ভুত লাগে মাঝে মাঝে, ওই শরীরে তুই কেন আবার ক্রিকেট খেলতে গেলি সেদিন। হ্যা আমরা সবাই জানতাম তুই খেলাটা ভালবাসতিস। খেলতিসও ভাল। তা বলে ওই শরীরে? জীবন টাকে খুব খেলাচ্ছলে নিয়েছিলিস তুই।

রোববার এর সকালে বাজার দোকান করে সবে মাত্র বাড়ি ফিরেছি, তখনই পেলাম খবরটা। বেশ কিছু সময় স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। মনে পড়ছিল আমার বাবার কথা। শেষের দিকে এক একজন বন্ধু হারানোর বেদনায় ভেঙে চুরমার হতে দেখেছি তাকে। সেদিন নিজে উপলব্ধি করেছিলাম কারনটা।

খেলতে খেলতেই চলে গেলি তুই। বলের সাথে ব্যাটটাও তো ভাল করতিস বোকা। এত তাড়াতাড়ি আউট হতে হয়? টি টোয়েন্টি এত টানতো তোকে? চালিয়ে খেলতে গেলি কেন? জীবনের এই ক্রিকেট ম্যাচে আমরা সকলে একাই বিরাট কোহলি, একাই অশ্বিন, একাই ধোনি রে। একবারও ভাবলি না তুই আউট হয়ে গেলে টিম টার কি হবে?

এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হয় রে বোকা। দেখ আজ আমরা কেমন ফেসবুক, হোয়াটস্যাপে বন্ধুত্বতা সেলিব্রেট করছি। ভুলে যাস না তোর নম্বর টা কিন্তু এখনো আছে রে আমাদের কনট্যাক্ট লিস্টে।

আজ ফ্রেন্ডশিপ ডের মেসেজ পাঠানোর সময় মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে উঠল রক্তিমের নাম টা। মন টা ভীষন ভারি হয়ে গেল আজ আবারও।

এই লেখা টা আজ শুধু তোরই জন্য রে রক্তিম।

যেখানেই থাকিস ভাল থাকিস বন্ধু। আবার ফিরে ফিরে আসিস আমাদের বন্ধু হয়ে।

হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ ডে।
বন্ধুত্বের মৃত্যু হয় না।

আগস্ট ৫, ২০১৮। রোববার

Sunday, July 29, 2018

মেকানিক

পল্টুদার গ্যারেজ সকলেই একডাকে চেনে। দেখতে দেখতে বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেল। মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা। পাড়ার গ্যারাজে ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে কাজ শেখা। আগ্রহটা ছিল ছোট্ট থেকেই। কাজেই অল্প দিনের মধ্যে গাড়ির দক্ষ মেকানিক হয়ে উঠল পল্টু।

আগে চারচাকা গাড়ির অত রমরমা ছিল না। বেশির ভাগই এম্বাসেডর ও অল্প কিছু ফিয়াট, অনেক পরে এল মারুতি। আর এখন তো দম ফেলার সময় পায় না। হরেক কিসিমের গাড়ি। তবুও যেকোন গাড়ি একবার খুলেই নিমেষে বুঝে যেত সমস্যাটা ঠিক কোথায়। আর সেই মতন কাজ। পল্টু যেন সাক্ষাৎ বিশ্বকর্মা।

সকাল সাতটায় গ্যারেজ খুলে বন্ধ করতে করতে প্রতিদিন রাত এগারোটা বেজে যায়। ইদানিং তিনজন ছেলেকে কাজে লাগিয়েছে তাও সব্বাই চায় পল্টুদা একবার নিজে চেক করুক। তাতেই যেন সকলের শান্তি।

এক একদিন এক একটা গাড়ি বেশ ভোগায়। সমস্যা খুজে বের করতেই সময় চলে যায়। কিন্তু সারানো হয়ে গেলে এখনো এই বয়সেও বেশ রোমাঞ্চ জাগে।

মিউনিসিপালিটির এম্বুলেন্সটা গতকাল থেকে বেশ ভোগাচ্ছিল। গতকাল অনেক রাত অবধি দেখেও সুরাহা কিছুই হয় নি। তবে আজ সকালে এসেই প্রবলেম টা ধরতে পারল পল্টু। ড্রাইভার এসে নিয়ে যেতে পল্টু একগ্লাস চা খেয়ে আয়েস করে বিড়ি ধরাল। তিনটে ছেলে এখন কাজ করছে।

ইদানীং শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।সকাল থেকেই আজ কেমন যেন মাথা ধরা ভাব, ঘাড়ে ব্যাথা। বেলা হতে ব্যাথাটা বাড়তে লাগল। আজ গ্যারেজ না খুললেই ভাল হত। এই সব ভাবতে ভাবতেই শরীরটা একেবারে ছেড়ে দিল। টুল থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বিশাল শরীরটা।

তিনটে ছেলে দৌড়ে এসে শুইয়ে দিল মাটিতে। একজন তড়িঘড়ি করে সাইকেল নিয়ে ছুটল ডাক্তারখানায়। ডাক্তারবাবু দেখেই বললেন একটা ম্যাসিভ এটাক হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যেতে।

মিউনিসিপালিটির এম্বুলেন্সটা এল। যেটাকে কিছুক্ষন আগেই সুস্থ করে ফেরত পাঠিয়েছেন পল্টুদা। স্ট্রেচারে তুলে এম্বুলেন্স ছুটল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। প্রায় আধঘন্টার পথ।

সরবিট্রেটটা জিভের নিচে দেওয়াতে এখন কিছুটা সম্বিৎ ফিরেছে। একটু জল খেতে চাইলেন। হুটার বাজিয়ে এম্বুলেন্সটা ছুটে চলেছে। মিনিট পনেরো পথ যাওয়ার পর মাঝ রাস্তায় একটা শব্দ করে গাড়ির স্টার্টটা বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও স্টার্ট করতে পারছে না। সময় ছুটে চলেছে। ওদিকে স্ট্রেচারে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন বিশ্বকর্মা পল্টুদা।

ড্রাইভার ও হেল্পারের দম ছুটে যাওয়ার অবস্থা। বেগতিক দেখে গ্যারেজের ছেলেটাও আপ্রান চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু কোন চেষ্টাই কাজে আসছে না। গাড়ির ভিতর ছটফট করছে পল্টুদা। কিছু একটা করা দরকার।

এইসময় যে লোকটাকে সবথেকে বেশি দরকার ছিল, সেই এখন গাড়ির ভিতর স্ট্রেচারে শুয়ে অসহায়, প্রায় অচেতন।

হঠাৎ করে ড্রাইভারের চোখ গেল পল্টুদার দিকে। স্ট্রেচারে শুয়েই কালিঝুলি মাখা হাতটা কোনক্রমে তুলে কি যেন ইশারা করছে পল্টুদা। ড্রাইভার ছেলেটা এগিয়ে গেল সেইদিকে।

গাড়ি বন্ধ হওয়ার আওয়াজেই আন্দাজ করেছিলেন সমস্যাটা। হাতের ইশারায় ড্রাইভারকে কোনমতে বুঝিয়ে দিতেই গাড়ি আবার স্টার্ট নিল। অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

গ্যারেজের ছেলেটা পল্টুদার মুখের কাছে এসে জিজ্ঞেস করতে চাইল জল খাবে কিনা। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেল না। মাথাটা হেলে পড়েছে বাঁ দিকে। সারা মুখে প্রশান্তির ছাপ স্পষ্ট। এখন যেন আর কোন যন্ত্রণাই নেই পল্টুদার। চোখের কোল বেয়ে নেমে এসেছে শুকিয়ে যাওয়া জলের ধারা। এই জলধারা নিশ্চিত ভাবেই আনন্দের। এম্বুলেন্সটা এখন হুটার বাজিয়ে ছুটে চলেছে হাইওয়ে দিয়ে তীর বেগে।

জুলাই ২৯, ২০১৮। রোববার।

Saturday, July 21, 2018

ভয়

গ্রামের ছোট্ট পরিসর থেকে উঠে আসা রবীন বাবু পড়াশুনায় বরাবরই মেধাবী ছিলেন। কিন্তু কলেজে পড়ার সময় থেকে জড়িয়ে পরলেন ছাত্র রাজনীতিতে। লেখাপড়া গেল চুলোয়। অভাবের সংসারে নিত্য অশান্তি লেগেই থাকত। কিন্তু রবীনের মাথায় তখন দিন বদলের নেশা।

অসম্ভব ভাল বাগ্মী ছিলেন। যে কোন সভা সমিতিতে রবীন বাবুর বক্তৃতা শোনার জন্য লোক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। যেমন ভঙ্গিমা তেমন গলার স্বর। সাথে প্রতিটি ঘটনার সাল তারিখের নিখুঁত বর্ণনা। মোহাবিষ্ট হয়ে শুনতেন সবাই।

নেতা থেকে মন্ত্রী হতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি স্বাভাবিক কারনেই। জনপ্রিয়তাও যথেষ্ট। কাজের লোকও বটে।

ইদানীং ব্যস্ত তিনি আগত সমাবেশ নিয়ে। বছরের এই সময়টা রবীন বাবুদের নাওয়া খাওয়ার সময় থাকে না। সাংগঠনিক কাজকর্ম সামলানো থেকে বক্তব্য পেশ করা। ঝক্কি অনেক।

কিন্তু কয়েকদিন যাবত একটা অদ্ভুত সমস্যা অনুভব করছেন রবীন বাবু। ডাকসাইটে নেতা তিনি। কিন্তু বেশি ভিড় সহ্য করতে পারছেন না। কথার খেই হারিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই।
এদিকে সমাবেশের সময় এগিয়ে আসছে। চারদিকে পোস্টারে ছয়লাপ। মুখ্য বক্তা হিসাবে রবীন বাবুর নাম।

দেখতে দেখতে সমাবেশের দিন এসে গেলো। গ্রামগঞ্জ, শহরতলী থেকে কাতারে কাতারে লোক উপস্থিত হয়েছে সমাবেশে।

সবাই শ্লোগান দিচ্ছে। গান বাজছে। একটা উৎসবময় আবহ। সঞ্চালক ঘোষনা করলেন এবার মুখ্য বক্তার বক্তৃতার পালা। হাততালিতে ফেটে পড়ছে চারদিক। রবীন বাবুর হাতে মাইক্রোফোন তুলে দিলেন সঞ্চালক।

দরদর করে ঘাম বইছে রবীনবাবুর শরীর থেকে। কিচ্ছু শব্দ মনে আসছে না তার। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন দিগন্তব্যাপী জনসমুদ্রের দিকে। শ্লোগান উঠছে মুহুর্মুহু। সময় এগিয়ে চলেছে। কিন্তু একটা শব্দও এখনো উচ্চারিত হয়নি রবীন বাবুর মুখ থেকে। একটা অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে আসছে তার মুখ থেকে। গলা শুকিয়ে কাঠ। মাইক্রোফোনটা ছুড়ে ফেলে পালাতে চাইলেন মঞ্চ  থেকে। শ্লোগান পালটে পরিনত হল চিৎকার। রবীন বাবু পালাতে গিয়ে সজোরে পড়লেন মঞ্চের উপর থেকে।

স্ত্রী জয়ার ডাকে ঘুম ভাঙল। ঢকঢক করে বেশ কিছুটা জল খেলেন। ক্যালেন্ডারে চোখ গেল। এখনো চারদিন বাকি সমাবেশের। সকাল হতেই ছুটলেন ডাক্তারের কাছে। সব শুনে ডাক্তারবাবু বললেন গ্লসোফবিয়ায় সম্পূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন বেশ কিছু দিন। রবীনবাবু হতাশ হয়ে বসে রইলেন।


জুলাই ১৬, ২০১৮। সোমবার।

দুঃসময়

সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? সন্ত্রাসে মরে সেনা মন্ত্রীরা করে হায় হায়। সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? মৃত সেনার ছবি খবরের পাতায় পাতায়। ...