Saturday, September 1, 2018

গন্ধ

অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে দিনুকে শুধুমাত্র তার ওই বোঁচা চ্যাপ্টা নাক টার জন্য। ছেলেবেলায় মা ঠাকুমা অনেক চেষ্টা করেছিলেন, যদি নিয়মিত তেল মালিশ করে নাক টাকে কিছুটাও লম্বা করা যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছুটি হয় নি।

ইস্কুলে পড়ার সময় বন্ধুরা কেবল হাসাহাসি করত। পাড়ার মেয়েরাও আড়ালে তাকে দেখে হাসত। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকত দিনু। শুধুমাত্র ওর এই  খ্যাঁদা নাকটার জন্য।

কারো বিষয়ে কারনে অকারনে কখনোই নাক গলাতো না দিনু। নাকই নেই, কাজেই তা গলানোর প্রশ্নও নেই। সেদিক থেকে সে ছিল নিশ্চিন্ত।

তবে, ছেলেবেলায় মায়ের গায়ের গন্ধটা কিন্তু আজো নাকে লেগে আছে। মমতা মাখা উনুনের ধোঁয়া লেগে থাকা অদ্ভুত এক গন্ধ। মাকে হারিয়েছে সেই কোন কালে, বাবাকে তো চোখেই দেখেনি। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে সেই গন্ধটা পায় দিনু। বিশেষ করে খুব ভোর বেলায়। মা ফিরে ফিরে আসে সেই গন্ধটার মধ্যে দিয়ে।

ভাত ফোটানোর গন্ধ, তেলেভাজার দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাকে ভেসে আসা গন্ধ, সদ্যজাত রসগোল্লার গন্ধ, রোল কাউন্টার থেকে ভেসে আসা ডিম ভাজার গন্ধ শুঁকেই পেট ফুলে ওঠে দিনুর। কেনার তো আর পয়সা নেই। ভাঁড়ে মা ভবানি।

গ্রীষ্ম কালে মাটি তেতে ওঠার গন্ধ, বিষ্টির পর মাটির সোঁদাসোঁদা গন্ধ, দুগগা পুজোর ঠিক পরে পরেই ছাতিম ফুলের গন্ধ, শীতকালে সোয়েটারের গন্ধ প্রতিটাই ভীষন রকম আলাদা। প্রতিটাই খুব মায়াবি। কালজয়ী।

চল্লিশ পেরোল গত জুনে। কিন্তু এখনো নাকে লেগে আছে রেশন দোকানের পত্রালি খাতার গন্ধ। গম ভাঙানোর গন্ধ। হঠাত করে নাকে আসা কোন ধুপের গন্ধে মনটা আকুলি বিকুলি করে ওঠে। আর সেই অগরুর গন্ধটা যেটা মায়ের শরীরের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল খাটে তোলার পর। অসহ্য অতি অসহ্য সেই গন্ধ।

এখন দিনরাত চায়ের দোকানেই কাটে দিনুর। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেরা ঢিল ছুড়ে মারে, রাগায়, ভেঙায়।

ইদানীং পাড়ার আস্তাকুঁড়ের খাবারে ছেলেবেলার গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করে দিনু রোজ। কোন খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়ালে গায়ে জল ছিটিয়ে তাড়িয়ে দেয় লোকে। যদিও তাতে দিনুর কিছুটা পেট ভরে। সর্দি হলেই তার যত কষ্ট।

অগাস্ট ২৮, ২০১৮। মঙ্গলবার।

No comments:

Post a Comment

দুঃসময়

সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? সন্ত্রাসে মরে সেনা মন্ত্রীরা করে হায় হায়। সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? মৃত সেনার ছবি খবরের পাতায় পাতায়। ...