Sunday, May 26, 2019

দোলের স্মৃতি

পাড়ার কৃষ্ণচূড়া গাছটার মতন বছরের এই সময়টাতে সকলের মন রঙিন হয়। অবহেলায় বেড়ে ওঠা গাছটা প্রতি মুহূর্তে জানান দেয় এখনো বসন্ত আসে আমাদের এই পোড়া দেশে। স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই দূর থেকে ডেকে ওঠে বোকা কোকিলটা। ছেলেবেলায় পড়ার ফাঁকে আমরাও ওই কোকিলের স্বরে ডাকতাম আর বোকা কোকিলটাও সাড়া দিত আরো জোরে।

এখন পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া দেখতে শহুরে হুজুগে মানুষ ছুটে যান পুরুলিয়ার গ্রাম গুলোতে। দামী ক্যামেরা সাথে নিয়ে। ফেসবুকের দেওয়াল লাল হয়ে ওঠে পলাশের রঙে। মন কতটা রঙিন হয় জানিনা, তবে বেশ একটা দেখনদারি লক্ষ করা যায়।

আমাদের এই অঞ্চলে আগে অসংখ্য জুটমিল ছিল। ফলে দিন আনা দিন খাওয়া দেহাতি লোকের বাস ছিল। চটের বস্তার গায়ে যে রঙ দিয়ে লেখা হত, সেই রঙ এই সময়টাতে জুটমিলের দেহাতি লোকেদের হাত ঘুরে চলে আসতো আমাদের কাছে। ওনারা ওই রঙ কখনোই বিক্রি করতেন না। সকলের সাথে ভাগ করে নিতেন স্বেচ্ছায়। দোলের পরেও ওই বাঁদূরে পাকারঙ আমাদের গায়ে লেগে খাকতো কমপক্ষে দিন পাঁচেক। আর হাতের চেটোতে কমপক্ষে পনেরোদিন। জুটমিলে শ্রমিক দের মধ্যে দেহাতি লোক ছাড়াও বেশ কিছু উড়িয়া লোকও ছিলেন তারাও দোল উৎসব পালন করতেন যত্নে তাদের উড়িয়া পট্টিতে। ওখানের গানের সুর ও তাল টাও বেশ মজার ছিল। বিকাল বেলা পালকি করে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ নিয়ে বেরোতেন ওরা। আনন্দময় হয়ে উঠত চারপাশ। সাধারন মানুষ সাধারন ছিলেন। খুব ছোট ছোট কাজেও সবাই আনন্দে মেতে উঠতেন।

দোল তখনো এতটা হোলি হয়ে যায় নি। পাড়ার হরিসভায় হরিনাম সংকীর্তন হত অষ্টপ্রহর। এখনো এটা বজায় আছে তবে জাঁকজমক কমেছে অনেক। দোলের পরে সাতদিন ধরে কীর্তন গান হত আর শেষের দুদিন যাত্রাপালা হত। প্রথমদিন কোলকাতা থেকে যাত্রাদল আসতো আর শেষদিন পাড়ার লোকেরা মিলেই যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করতেন। আমরা ছোটরা সাজঘরে উকি দিতাম। অতি সাধাসিধে মানুষ কি রকম ভাবে ভয়ংকর রাবন রাজায় সেজে উঠতেন দেখতাম অবাক চোখে। আসলে তখন তো ঘরে ঘরে টিভি ছিল না। সাজঘরে উকি দিয়েই একবার সীতাকে বিড়ি খেতে দেখেছিলাম। বিস্ময়টা ছিল মনের ভিতর বহুদিন।

দোলপূর্নিমার আগে র রাতে গঙ্গা থেকে জল সয়ে এসে শুরু হত হরিনাম গান। গঙ্গার ওপার থেকে দেখা যেত উত্তরপাড়ার দোল তলার আতশবাজি পোড়ানো।একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। পাড়ার হরিসভা থেকে প্রথম প্রথম গানের আওয়াজ পাওয়া গেলেও একটু রাত বাড়লে শুধুই শ্রীখোল আর খঞ্জনির আওয়াজ ভেসে আসতো কানে। চাঁদের আলোয় ভেসে যেত ঘর। আর তার সাথে মাঝে মাঝে শ্রীরাধা গোবিন্দ জয়ো ধ্বনি। একরাশ মায়া তৈরি হত মনের কোনে।

এই সময়টাতে, বেশ কিছুদিন ধরে ঝরে যাওয়া পাতা গুলো সংগ্রহ করে রাখতাম আমরা। সাথে ফেলে দেওয়া মিস্টির হাড়ি। নারকেল গাছের পাতা ও সুপুরি পাতার কদর ছিল সবথেকে বেশি।  ইস্কুল থেকে ফেরার পথে যে যেমন পারতো শুকনো পাতা জড়ো করতাম আমরা ন্যাড়াপোড়ার জন্য। আর বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হত আলু। আলুপোড়া খাওয়া হত খুব মজা করে। এখন এই শহরতলি তেও খুব একটা দেখতে পাই না। তবে কিছু কিছু জায়গায় এখনো হয় বলে শুনি। আমরা চ্যাঁচোর বলতাম।

এই দোল উৎসবের মধ্যে একটা সাম্যবাদ দেখতে পাই। আগের দিনের বাঁদূরে রঙ বা এখনকার সময়ের ভেষজ আবিরে রঙিন হওয়ার পর পাড়ার ডাকসাইটে দাদা ও সাইকেলের দোকানের মেকানিক সবাই সমান।  বেলা বাড়ার সাথে সাথে সবার গায়ের জামাই ইলেক্ট্রিকের তারে। ফ্যাকাসে রাস্তাতেও তখন রঙের কারুকাজ।

দোলের সকাল বেলা টা শুরু হত, বাড়ির গুরুজন দের পায়ে ফাগ দিয়ে। জলখাবার খেয়ে স্থানীয় বন্ধুরা মিলে আমরা রঙ খেলতাম। হ্যা সেই বাঁদূরে রঙ দিয়ে। আমরা কখনোই দেখার সুযোগ পাই নি যে রঙ মাখার পর আমাদের এই চাঁদ বদনটাকে কি রকম দেখায়। তবে রঙ খেলে বাড়ি ফিরলে প্রতি বছরই মা বলতো নাকি ভুতের মতন লাগছে।

এখন দোল খেলার থেকেও বিভিন্ন বিভঙ্গে নিজের ছবি তোলার হিরিক লক্ষ করি। নিজের ফেসবুকের দেওয়ালে ওই ছবি সাঁটানো না অব্ধি কারো যেন শান্তি নেই। তারপর পছন্দ হোক বা না হোক লাইকের কাউন্টিং। শো অফ টা বড্ড চোখে লাগে।

এই বিশেষ সময়ে বাজারে আসে বিভিন্ন রঙের মঠ ও ফুটকড়াই ও মুড়কি। আমাদের ছেলেবেলায় দোলের পরে রঙিন মঠ লেবুর জলে গুলে খাওয়ার মজা এখনকার প্রজন্ম ভাবতেই পারবে না। হ্যা অবশ্যই কাঁচের গ্লাসে।আসলে এখনকার এই চুড়ান্ত বিশ্বায়নের জুগে সব ভীষন সহজলভ্য।

মানুষের মন অনেক বেশি রঙিন ছিল। ভরসা ছিল, বিশ্বাস ছিল পাকা রঙের মতন গাঢ়। তাই সেই রঙ টাকে ফলাও করে বাহ্যিক করে তুলতে হত না। এখন এই সমাজের অন্তরের রঙ এতটাই ফ্যাকাসে, যে 'লাগে মাস্কারা দু চোখ আঁকতে। ক্লান্তির কালো রঙ কে ঢাকতে'।
সবাই দেওয়াল ভরিয়ে তুলে জানান দিতে চায় দেখ 'কি সুখে রয়েছি আমি'।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ২১ শে মার্চ ২০১৯

Tuesday, February 26, 2019

আজ তোমার সাথে আড়ি

মেহেদী হাসান, গুলাম আলি
আজ তুমি সন্ত্রাসী
কাল তোমার সাথে ভাব
আজ আমি বড্ড আগ্রাসী।

তোমার সেই স্বপ্নের স্পেল
মন্ত্রমুগ্ধ পরাক্রম
তোমার বোলিং দেখব না আর
ওয়াসিম আক্রম।

কাল তুমি ছিলে শান্তি মিছিল
উগ্র দেশপ্রেমে
আজ মাতলে উল্লাসে
রাজপথে নেমে।

মোমবাতিটার নেই তো দেশ
কাল সীমানার গন্ডী
কাল জ্বলেছে সীমান্তে
আর আজ উগ্রচণ্ডী।

কত সন্ত্রাসী মরলো যে আজ
যুদ্ধ বিমান হানায়
মিরাজ কি সে চিনতে পারে
না কি তাকে কেউ চেনায়।

মধ্যবিত্ত আমরা বাঁচি
দিন গুজরান মায়ায়
মানুষ যারা মরল যে আজ
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়।

তুমি মারবে পঞ্চাশ
আর আমি মারবো দুশোয়
রাজনীতিবিদ ঠাঁই পেয়ে যাবে
মোমের মাদাম তুসোয়।

নিলাম বদলা এক পশলা
হঠাৎ শিলা বৃস্টি
এপারে আজ কালবৈশাখী
ওপারে গোলাবৃস্টি।

দোহাই তোমায় দিব্যি বলছি
করিনা রাজনীতি
হঠাত রাতে ঘুম ভেঙে যায়
গণহত্যায় ভীতি।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

Thursday, February 14, 2019

ভালোবাসার দিনে

যাচ্ছে হয়ে হন্তদন্ত সদ্য শাড়ী
সাথে হলুদ পাঞ্জাবী হালকা দাড়ি
থাকুক ভাল, রাখুক ভাল এই আকালে
ভালবাসার উদযাপনের এই সকালে।

ক্লাস নাইনের মিষ্টি নিতাও ভালোবাসে
কিডনি রোগে রুগ্ন বাবার সত্তাটাকে
তার কাছেও উদযাপন এই ভ্যালেন্টাইন
ডায়ালিসিস শেষে বাবার নেইকো টাইম।

আর হায়দার বস্তির ওই ঘুপচি ঘরে
ছোট্ট মিনার একফালি হাত আঁকড়ে ধরে।
কেউ নেই ওর এই দুনিয়ায় মিনা ছাড়া
ভ্যালেন্টাইন বুড়োর চোখে জলের ধারা।

লিখুক ছাপুক আর্চিও তার গ্রিটিংস কার্ডে
মানুষ কেমন এই আকালেও স্বপ্ন দেখে।

~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
~ ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯

Thursday, December 6, 2018

ছেলেবেলার শীত

আমাদের এখানে হেমন্ত কখন যে আসে ঠিক টের পাওয়া যায় না। দুগগা ঠাকুর বা কালি ঠাকুর জলে পড়লেই গা ছ্যাঁত ছ্যাঁত করতো।  ছেলেবেলায়, পুজোর রেশ মিটতেই মা কাকিমারা যখন আলমারি থেকে উল কাঁটা বের করতেন, তখন বোঝা যেত আর কিছু দিন বাদেই শীত আসছে। গ্রাফ পেপারে রকমারি ডিজাইন এঁকে সেগুলো অনায়াস দক্ষতায় দুটোমাত্র কাঁটার সাহায্যে রঙিন উল দিয়ে ফুটিয়ে তুলতেন বাড়ীর মা কাকিমারা। বাড়িতেই তৈরি হত সোয়েটার, মাফলার, টুপি, মোজা, গ্লাভস আরো কত কি।

দু তিন দিন অন্তর বুকের ছাতির মাপ নেওয়া হত। সাথে গলা ও পিঠেরও। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কবে বোনা শেষ হবে। আর পরদিনেই ইস্কুলে পরে যাব সেটা।

ইস্কুলে গিয়েও বন্ধুর মায়েরা কাছে ডেকে নিতেন নতুন ডিজাইন গুলো নিজেরা তুলে নিতে।

অনেকের বাড়িতে কুরুশের কাজও করা হত। এখন আর সেসব খুব একটা দেখতে পাই না। ছেলেবেলায় পুরানো সোয়েটার, যেগুলো ছোট হয়ে গেছে, তা থেকে উল খুলে নিয়ে বড় বড় উলের গোলা বানাতাম আমরা। সে এক বড় মজার ব্যাপার ছিল। সেই খোলা উল দিয়ে আবার তৈরি হত নতুন সোয়েটার, নতুন ডিজাইনের।

সত্যজিৎ বাবুর সিনেমায় এখনো দেখা যায় বাড়ির মহিলা দের উলের সোয়েটার বানানোর ছবি। সেলুলয়েডেই সাক্ষী থেকে গেছে।

কোন সান্টাক্লজ আমাদের ছেলেবেলায় শীত বয়ে আনতেন না। শীত বয়ে নিয়ে আসতেন জয়নগরের মোয়াওলা মাথার ডালা ভরে। ভরা দুপুরে হেঁকে যেতেন সুরেলা গলায়, জয়নগরের মোয়া, নলেন পাটালি গুড়।

কেক খাওয়ার রেওয়াজ বরাদ্দ ছিল বছরে একদিনই, বড়দিনে। অবধারিত ভাবে চলে আসত বড়ুয়া বেকারি। পেস্ট্রি খাওয়ার চল হয়েছে অনেক অনেক পরে।

আখের রসের গাড়ি ছিল, কিন্ত আমরা তার থেকেও বেশি মজা পেতাম দাঁত দিয়ে ছাড়িয়ে খেতে। মুখ ছড়ে গেলেও এর মজা ছিল ঢের বেশি। শীতের দুপুরের নরম রোদ্দুর পিঠে মেখে আখ খেতেও এখন আর খুব একটা কাউকে দেখি না।

ভরা শীতে সব পাড়া ম ম করতো নলেন গুড়, পাটালির গন্ধে। পিঠে, পুলি, পাটিসাপটা, রসবড়া আরো কত কি। এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়। এখন তো প্রায় সবই দোকানে বিক্রি হয়।

রবিবারের সকালে ধপধপে সাদা ফুলকো লুচি দিয়ে পয়রা গুড় খাওয়ার জন্যই আবার এখানে জন্মানোর ইচ্ছে জাগে মনে। অমৃতের স্বাদ কি রকম জানি না তবে সেটা নিশ্চিত এর থেকে ভাল হতেই পারে না।

শীতে ফি বছর সার্কাস ময়দানে আসতো অলিম্পিক সার্কাস। কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে অবাক বিস্ময়ে দেখতাম ট্রাপিজের খেলা। হাসিতে ভরিয়ে তুলতেন জোকার কাকুরা। অর্কেস্ট্রা বাজতো সার্কাসে। হ্যা ঠিকই পড়লেন, অর্কেস্ট্রা বাজতো। এখন তো প্রিরেকর্ড করা বাজনা বাজে। হাতি, বাঘ, সিংহ, জলহস্তীরাও ছিল সার্কাসের অঙ্গ। সেসব হারিয়েছে বহুদিন হল।

শীত পরলেই মনে পরে আমাদের পাড়ার মাঠে পুতুল নাচের আসর বসতো। তারা আসতো রকমারি পালা নিয়ে। প্রচার হত রিক্সা গাড়িতে চোঙা লাগিয়ে ও সাথে হাতে আঁকা পোস্টার। মাঠে চট বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা থাকতো। চলতো প্রায় দিন পনেরো। ভারি মজার ছিল সেই সময় গুলো।

আসতেন এক সাইকেল চালক দাদা। দিন সাতেকের জন্য। অবিরাম সাইকেল চালিয়ে যেতেন তিনি। মোটেই নামতেন না সাইকেল থেকে। গোল হয়ে ঘুরতেন মাঠ জুড়ে। দু এক দিনের মধ্যেই পাড়ার একজন হয়ে উঠতেন তিনি। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকতাম তার কুশলতা দেখে। আমাদের ছেলেবেলার হিরো হয়ে উঠতেন অল্পদিনেই। গায়ে পুরানো টিউব লাইট ভাঙতেন। আর শেষ দিনে মাটির নিচে কবরে যেতেন। অনেকক্ষন মাটির নিচে থাকতেন। সে সময় কেউ একটাও কথা বলতো না।পরে বের করে আনা হত অচৈতন্য অবস্থায়। সুস্থ করা হত দুধ রুটি দিয়ে। একাজে এগিয়ে আসতেন পাড়ার প্রায় সব মহিলারাই।

শীত মানেই কাঁধে গাঁটরি নিয়ে হাজির হতেন কাশ্মীরি শাল ওলা। যাদের সামর্থ্য ছিল, তারা কিনতেন। আমাদের কখনো কেনা হয়ে ওঠেনি।

যখন আমরা খুব ছোট, তখন একবার শহরে এসেছিল রাশিয়ান সার্কাস। এক্কেবারে অরিজিনাল। খুব সম্ভবত নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। ঠিক মনে নেই। অনেক বন্ধুরা গিয়ে দেখে এসেছিল।

শীত মানেই অবধারিত ভাবে চলে আসে, কফি খাওয়ার কথা। ভেতো বাঙালির কফি বিলাস। সাধ পুরন করতো নেসক্যাফে।

ইডেন গার্ডেনে ক্রিকেট খেলাটা তখন শীতেই হত শুধুমাত্র। সারা বছর জুড়ে ক্রিকেট খেলার চল ছিল না সে সময়। নরম রোদ গায়ে মেখে টেস্ট ক্রিকেট দেখার মাহাত্য এখন হারিয়েছে অনেকটাই।

তবে এখনো শীত আসে এ শহরে। অন্যভাবে। বেশিরভাগ ছেলেবেলার মজাই হারিয়ে গেছে চিরতরে। বয়স বাড়ছে। অল্পেই শীত ধরে এখন।

সৌমিক মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ৪, ২০১৮। মঙ্গলবার

Sunday, September 30, 2018

অনুরোধ

২০১০ সালের আজকের দিনেই BIFR এ চলে গেছিল এই সংস্থাটি। শেষের শুরু আজকের এই দিন টা থেকেই।

দেখতে দেখতে অনেক গুলো বছর পেরিয়ে গেলো। ছবি গুলো আজও চোখের সামনে ভেসে আসে। পুজোর আগে বিশ্বকর্মা পুজোর জাঁকজমক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বোনাস পেয়ে শ্রমিক কর্মচারী দের আনন্দচ্ছল মুখ। সব কেমন যেন হারিয়ে গেলো।

আরিয়াদহ, কামারহাটি, দক্ষিণেশ্বর অঞ্চলে ইন্ডিয়া ফয়েলস লিমিটেড এর কথা বলছি। এলাকায় বয়স্ক জনেরা ভেনেস্তা নামেই এখনো অনেকে ডাকেন। যদিও এই নামকরন ১৯০৫ সালের। শেষমেশ নাম বদল হয়ে হল এস ডি এলুমিনিয়াম।

এলুমিনিয়াম ফয়েল প্রস্তুতকারক এই সংস্থা আমাদের অঞ্চলের একটা ল্যান্ডমার্ক ছিল। ব্রিটিশ আমলের এই কোম্পানি তে কাজ করার স্বপ্ন দেখতো শিক্ষিত মানুষজন। জীবিকার্জনের জন্য এলাকায় প্রসিদ্ধি ছিল এই সংস্থার।

পরবর্তী সময়ে খৈতান গোষ্ঠী যথেষ্ট সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন এই সংস্থাকে। এ সবই এখন ইতিহাস।

ভীষন ভীষন খারাপ লাগে যখন দেখি এই রকম নামী একটা কোম্পানি চোখের সামনে ধংস্ব হয়ে গেল। ভুল বললাম নস্ট করে দেওয়া হল। ম্যানেজমেন্ট ভুল, নাকি শ্রমিকদের দিশাহীনতা, নাকি অন্য কিছু তা জানি না। তবে ভিতরে ভিতরে রক্তাক্ত হই বন্ধুস্থানীয়দের দেখে। যারা এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন।

শুনতে পাই বকেয়া টাকা, গ্রাচুইটির টাকা, পিএফ এর জমানো টাকা কিছুই এনারা পান নি। কবে পাবেন তাও বোধহয় কেউ জানেন না। গা শিঊরে ওঠে। মাইনে পেয়েও যেখানে এই দুর্মুল্যের বাজারে সংসার চালানো কস্টকর, সেখানে এনাদের চলে কি করে। অনেককেই দেখি বিকল্প কাজের সন্ধান করতে।

খুব খারাপ লেগেছিল দেখে যে এনারা কেনো কোনো আন্দোলনে গেলেন না। রথতলার মোড়ে কিছুদিন লিফলেট বিলি করে, কিছুদিন মাত্র অবস্থান করে, ধর্মতলায় লিফলেট বিলি করে কেন এনারা ক্ষান্ত হলেন? নিজেদের কথা আরো বৃহত্তর পরিমন্ডলে ছড়িয়ে দিলেন না কেন? কেন মাত্র এক দু দিন বাজারী কাগজে ছাপা হল এনাদের দুর্দশার কথা। যেখানে শিল্প বন্ধের জন্যে দীর্ঘ দিন অবস্থান বিক্ষোভ হয়, সেখানে জলজ্যান্ত একটা কারখানা এভাবে কেন বন্ধ হয়ে গেলো? আরো তেজদ্বীপ্ত হওয়া যেত না কি?

জানি প্রশ্ন গুলো সহজ।
কিন্তু আমার কাছে উত্তর জানা নেই। কারোকাছে থাকলে জানাবেন।

যারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তাদের কাছে আমার বিনম্র অনুরোধ, একটু মানবিকতা দেখান। কারখানার গেটে নরনারায়ন সেবার মতন খাবার ব্যবস্থা না করে, সম্মানের সাথে মাথা তুলে বাঁচতে সাহায্য করুন কর্মচারীদের। ভবিষ্যতে কারখানা খোলার সম্ভবনা যদি একান্ত নাও থাকে, এনাদের প্রাপ্য বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাটা অন্তত করুন।

সব্বাই ভাল থাকলে, তবেই আমরা সকলে ভাল থাকব।
পুজো আসছে, রাস্তায় রাস্তায় আলো লাগছে। কিন্তু এত আলোতেও, এলাকার কর্মহীন  মানুষের মনের অন্ধকার দূর হবে কি?

পরিশেষে বলি ইন্ডিয়া ফয়েলস ছাড়াও অন্যান্য অনেক কারখানা আজ এই এলাকায় বন্ধ হয়ে আছে। আর্থ সামাজিক অবস্থা ভয়াবহ। অনুরোধ কোন রাজনীতি খুঁজবেন না এই লেখায়। যদি কিছু মাত্র ভুল বলে থাকি, তবে ভুল টা শুধরে দেবেন এই আশা রাখি।


সৌমিক মুখোপাধ্যায়
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮।

Saturday, September 1, 2018

গন্ধ

অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে দিনুকে শুধুমাত্র তার ওই বোঁচা চ্যাপ্টা নাক টার জন্য। ছেলেবেলায় মা ঠাকুমা অনেক চেষ্টা করেছিলেন, যদি নিয়মিত তেল মালিশ করে নাক টাকে কিছুটাও লম্বা করা যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছুটি হয় নি।

ইস্কুলে পড়ার সময় বন্ধুরা কেবল হাসাহাসি করত। পাড়ার মেয়েরাও আড়ালে তাকে দেখে হাসত। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকত দিনু। শুধুমাত্র ওর এই  খ্যাঁদা নাকটার জন্য।

কারো বিষয়ে কারনে অকারনে কখনোই নাক গলাতো না দিনু। নাকই নেই, কাজেই তা গলানোর প্রশ্নও নেই। সেদিক থেকে সে ছিল নিশ্চিন্ত।

তবে, ছেলেবেলায় মায়ের গায়ের গন্ধটা কিন্তু আজো নাকে লেগে আছে। মমতা মাখা উনুনের ধোঁয়া লেগে থাকা অদ্ভুত এক গন্ধ। মাকে হারিয়েছে সেই কোন কালে, বাবাকে তো চোখেই দেখেনি। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে সেই গন্ধটা পায় দিনু। বিশেষ করে খুব ভোর বেলায়। মা ফিরে ফিরে আসে সেই গন্ধটার মধ্যে দিয়ে।

ভাত ফোটানোর গন্ধ, তেলেভাজার দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাকে ভেসে আসা গন্ধ, সদ্যজাত রসগোল্লার গন্ধ, রোল কাউন্টার থেকে ভেসে আসা ডিম ভাজার গন্ধ শুঁকেই পেট ফুলে ওঠে দিনুর। কেনার তো আর পয়সা নেই। ভাঁড়ে মা ভবানি।

গ্রীষ্ম কালে মাটি তেতে ওঠার গন্ধ, বিষ্টির পর মাটির সোঁদাসোঁদা গন্ধ, দুগগা পুজোর ঠিক পরে পরেই ছাতিম ফুলের গন্ধ, শীতকালে সোয়েটারের গন্ধ প্রতিটাই ভীষন রকম আলাদা। প্রতিটাই খুব মায়াবি। কালজয়ী।

চল্লিশ পেরোল গত জুনে। কিন্তু এখনো নাকে লেগে আছে রেশন দোকানের পত্রালি খাতার গন্ধ। গম ভাঙানোর গন্ধ। হঠাত করে নাকে আসা কোন ধুপের গন্ধে মনটা আকুলি বিকুলি করে ওঠে। আর সেই অগরুর গন্ধটা যেটা মায়ের শরীরের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল খাটে তোলার পর। অসহ্য অতি অসহ্য সেই গন্ধ।

এখন দিনরাত চায়ের দোকানেই কাটে দিনুর। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেরা ঢিল ছুড়ে মারে, রাগায়, ভেঙায়।

ইদানীং পাড়ার আস্তাকুঁড়ের খাবারে ছেলেবেলার গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করে দিনু রোজ। কোন খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়ালে গায়ে জল ছিটিয়ে তাড়িয়ে দেয় লোকে। যদিও তাতে দিনুর কিছুটা পেট ভরে। সর্দি হলেই তার যত কষ্ট।

অগাস্ট ২৮, ২০১৮। মঙ্গলবার।

পার করেগা...

অনেক শ্রাবন দেখলাম এই জীবনে। ছেলেবেলায় শ্রাবন বলতে ছিল সারা মাস জুড়ে  বাইশ তারিখের প্রস্তুতি। সকলের আদরের, প্রানের ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। গান, কবিতা, নাটক এই সব নিয়ে আট থেকে আশির মেতে থাকা। পাড়ায় পাড়ায় ছোট ছোট মঞ্চ তৈরি করে শ্রদ্ধা জানানো।

ইদানীং শ্রাবন এলেই পথ চলতি সাধারন মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। বিশেষ করে শনিবার সন্ধ্যের পর থেকেই রাজপথ চলে যেতে থাকে ভক্তদের হাতে। হঠাৎ করে মানুষের মধ্যে এত ভক্তি ভাব এল কোথা থেকে এই ভাবনা মনে চলে আসে বারবার।

এইসব ভক্তদের উতসাহিত করার জন্য পথের ধারে সারি সারি মনোরঞ্জন এর পসরা। অঢেল খাবারের আয়োজন।

আফশোস হয়, যারা এই খাবার এর আয়োজন করেন, তারা পালা করে সারা বছর ধরে যদি এই প্রচেষ্টা চালান, তাহলে গরীব মানুষ গুলো দুমুঠো খেতে পারে।

প্রশাসক যিনিই হোন, ধর্মকে ঘাঁটাতে কেউই সাহস পান না। তাই এদের বাড়বাড়ন্ত বেড়েই চলে। কি অসম্ভব এনার্জি লেভেল। তারিফ না করে পারা যায় না। কিন্তু সবটাই বাবার মাথায় ঢেলে শেষ হয়ে যায়।

তারস্বরে মাইকে বাবার জয়গান, সাথে মজুত সব রকমের বাবার প্রসাদ। বাচ্চা থেকে মাঝবয়সী সবাই প্রসাদ প্রার্থী। কাঁধে বাঁক। মুখ ভরতি লালথুতু যা মাঝে মাঝে ভরিয়ে দিচ্ছে রাজপথ। রাস্তা জুড়ে প্লাস্টিকের গ্লাস, কাপ, শালপাতার ঠোঙা।

এ কোন পথে চলেছে কোলকাতা? বাংলাভাষী সাধারন মানুষজন নিজেদের সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে মেতে উঠছে অন্য রাজ্যের সংস্কৃতি নিয়ে।

এ এক নতুন কালচার।
এক নতুন রাজনীতি।
এক নতুন ভীতি।
এক নতুন দুঃসময়।

১২ আগস্ট, ২০১৮। রোববার।

দুঃসময়

সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? সন্ত্রাসে মরে সেনা মন্ত্রীরা করে হায় হায়। সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? মৃত সেনার ছবি খবরের পাতায় পাতায়। ...