Sunday, July 15, 2018

অপ্রাপ্তি

এক এক দিন এরকম হয়। দম ফেলার সময় পাওয়া যায় না। একটার পর একটা ডেড বডি আসতেই থাকে। আর সাথে শ্মশান যাত্রী ছেলে ছোকরার দল। তাও এখন সংখ্যা অনেক কমে গেছে কাচের গাড়ি আসার পরে। শহুরে লোকেদের লোকবলও এখন অনেক কম।

গরীব খেটে খাওয়া মানুষ মারা গেলে তবু অনেক লোক জন আসে। ময়নার চায়ের দোকানের বিক্রি বাটাও জমে যায় সেইসময়ে।

বয়স তো নেহাত কম হল না। গতবছর আধার কাডে নাম লেখানোর সময় আন্দাজেই বয়স বলেছিল ছত্রিশ।
ছোট থেকেই ডাকাবুকো স্বভাবের। মা কবে যে মরে ভুত হয়ে গেছে এখন আর মনে পড়ে না। বাবা রিক্সা চালাতো পাড়ায়। আর রাতে মদ খেয়ে বেশিরভাগ সময় রাস্তাতেই পড়ে থাকতো। ময়নার যখন বছর পনেরো বয়স, তখন ওর বাবাও পটল তুললো। বস্তির ঘরে একা ওই বয়সের মেয়ের থাকা যে কি ভয়ানক তা আর বলার নয়। লেখা পড়া তো আর শিখতে পারে নি, তাই গঙ্গার ধারে শ্মশানঘাটে চায়ের দোকান দিল। সেখানেও পাড়ার দাদারা দুবেলা এসে হুজ্জোতি করতো। সবই সয়ে গেছিল ময়নার।

বলরাম কে খুব ভাল লাগতো ওর। গ্রাম থেকে আসা ছেলে টা পাড়ার লেদ কারাখানায় কাজ করত। মাকে নিয়ে বস্তির একটা ভাড়া ঘরে থাকতো।

খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। ঠিক ওর বিপরীত। ওর দোকানে মাঝে মাঝেই চা খেতে আসতো। কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলতে পারে নি ভাল লাগার কথা।

বছর দুয়েক পর বলরাম এবং ওর মা চলে গেলো অন্য কোন জায়গায়।

কেবল টিভিতে মাঝে মাঝে সিনেমা দেখার সময় মনে পড়ে যায় বলরামের কথা। যত্ত সব পাগলামি। নিজের মনেই হাসে ময়না।

আজ সারাদিন প্রচুর ডেড বডি এসেছে। ময়নার চাও বিক্রি হয়েছে বেশ ভালই। এখন রাতও অনেক হল। এবার দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে হবে।

আবার একটা ডেড বডি আসছে। না ঝাঁপ যখন ফেলেই দিয়েছে আর খুলবে না ময়না এত রাতে। বস্তির ডেড বডি মনে হচ্ছে যেন। সাথে অনেক লোক। মনে হয় কোন অল্পবয়সী লোক মরেছে। খই উড়ছে বাতাসে। সচরাচর বস্তির লোকেরা যেরকম তারস্বরে হরিবোল বলে সেরকম বলছে না। শোকের ছায়া স্পষ্ট সকলের মধ্যে।

একটা বুড়ি হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে, তাকে সামলে রেখেছে কয়েক জন মিলে। বুড়ির একমাত্র অবলম্বন ছিল এই ছেলেটা। তিন দিনের জ্ব্ররেই চলে গেলো। সামনে আসতে লাইটপোস্টের আলোয় বলরামের বুড়ি মা কে চিনতে পারলো ময়না।

চুল্লি নিভতে নিভতে রাত একটা বেজে গেল। শেষ অবধি ময়না গঙ্গার ঘাটে বসেই কাটিয়ে দিল। শ্মশানযাত্রীরা সবাই চলে যাওয়ার পরেও অনেক রাত অবধি গঙ্গার ঘাটেই বসে রইল। অনেক রাতে ভেজা অস্থি তে জল ছিটিয়ে দুহাত তুলে প্রনাম করল ময়না। বুক চাপড়ে হাউহাউ করে কেঁদে ডাকাবুকো মেয়েটা।


সৌমিক মুখোপাধ্যায়।
৮ জুন, ২০১৮। শুক্রবার।

No comments:

Post a Comment

দুঃসময়

সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? সন্ত্রাসে মরে সেনা মন্ত্রীরা করে হায় হায়। সত্যি কি আমাদের কিছু আসে যায়? মৃত সেনার ছবি খবরের পাতায় পাতায়। ...