গতকাল অনেক বছর পর রথের মেলায় গেলাম। বারেবারে মনে পড়ছিল আমাদের ছেলেবেলার দিন গুলোর কথা। মনে হচ্ছিল যেন এই তো সেদিনের কথা।
আমদের ছেলেবেলার রথের মেলা মানেই ছিল পাপড় ভাজা, জিলিপি, আলুর চপ এবং অবশ্যই মাটির পুতুল কেনা। হরেক রকমের পুতুল - মাছউলি, ঝুড়ি মাথায় বউ, বাঁক কাঁধে মিস্ত্রী, সৈনিক, ট্রাফিক পুলিশ, রাধামাধব, একছাচের জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা এবং আরও কত্ত রকম। এই সবই কিনতাম আমরা ঝুলন সাজাবো বলে। এখনকার দিনের পুতুলের মত ফিনিশ ছিল না হয়ত, কিন্তু সেগুলো বানানো হত পরম যত্নে এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই।
কিছু পুতুল আসতো ঘুরনি থেকে। অসম্ভব সুন্দর। তাদের মধ্যে ঘাড় নাড়া বুড়োবুড়ি খুব বিখ্যাত ছিল। সব বাড়িতেই খুজলে একটা না একটা পাওয়া যেত। আর বিক্রি হত বিভিন্ন মহাপুরুষ দের পুতুল। তার মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় ছিলেন নেতাজী। তার পরে রবিঠাকুর, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ এনাদের পুতুল। এখন মেলায় এসব আর দেখা যায় না খুব একটা। এখন সব চাইনিজ পুতুলের রমরমা। ব্যাটারি চালিত।
আমাদের ছেলেবেলায়, রথের দড়ি টানার থেকে পুতুল কেনার আগ্রহ ছিল ঢের বেশি। কারন একটাই ঝুলন।
ঝুলনের আগে থেকে কাঠের গুড়ো জোগার করা, তাতে বিভিন্ন রং করা, কোনোটা সবুজ (মাঠের রঙ) , কোনোটা কালো (রাস্তার জন্য)। বালিও আনা হত রাস্তা বানানোর জন্য।
জোগাড় করা হত পুরানো কাপড়, ভাঙা ঈট পাহাড় বানানোর জন্য। পুরানো কাপড়ে মাটি লেপে ঈটের উপর চাপিয়ে পাহাড় বানানো হত। তার ফাঁকেফাঁকে লাগানো হত কামিনি গাছের ডাল পালা। আর তার ফাঁকে লুকিয়ে থাকতো প্লাস্টিক এর সৈনিক। সকলের হাতেই থাকত আগ্নেয়াস্ত্র। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বা শুয়ে।
পাহাড়ের সামনে বানানো হত গ্রাম, খেলার মাঠ, ইস্কুল, রাস্তা, হাসপাতাল। গ্রামের মোড়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ। আর গ্রামের এক কোনে গাছের নিচে স্থান হত রাধামাধবের। সব পরিকল্পনাটাই নির্ভর করত কার কাছে কেমন ধরনের পুতুল আছে তার ওপর আর নিজের নিজের সাজানোর দক্ষতার উপর।
বাড়ির বড়রা এই ঝুলন সাজানোতে খুব একটা সাহায্য করতেন না কখনো। যা সাজানো হত, সবটাই সাজাতাম আমরা নিজেরাই। শুধু রাতে যাতে সুন্দর লাগে দেখতে, তারজন্য আলোর ব্যবস্থা করে দিতেন বাড়ির বড়রা ছোট ছোট টুনি বালব দিয়ে।
এখন কাউকে আর দেখিনা ঝুলন সাজাতে। পুতুল কেনা তো অনেক দুরের কথা। আমার মনে হয় বিষয়টা কিন্তু দারুন ছিল। এখনকার ছোটরা মানসিকতায় অনেক অনেক বড় আমদের থেকে। তারা মাঠে না গিয়ে মোবাইলেই গেমস খেলে। আমরা নিত্য খেলাধুলো করা সত্যেও অনেক বড় বয়স অব্ধি জানতাম না ক্রিকেট, ফুটবলের বিভিন্ন পজিশন গুলোর নাম। এখনকার ছোটরা সব জানে।
বড্ড তাড়াতাড়ি পালটে গেলো সময়টা। পাল্টালাম আমরাও। চেষ্টা করে গেলাম আপ্রান পাল্টাতে। পারষ্পরিক সম্পর্ক এর গ্যাপ বাড়তে লাগল। আর আমরা জেনারেশন গ্যাপ কমাতে ছূটলাম। ঝুলন বিদায় নিল। বিদায় নিল মাটির পুতুল।
বিদায় নিল অনেক কিছু।
কোনটা পরে, কোনটা আগে। বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয়।
মাঝে মাঝে একলা লাগে।
~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
জুলাই ১৫, ২০১৮। রোববার।
আমদের ছেলেবেলার রথের মেলা মানেই ছিল পাপড় ভাজা, জিলিপি, আলুর চপ এবং অবশ্যই মাটির পুতুল কেনা। হরেক রকমের পুতুল - মাছউলি, ঝুড়ি মাথায় বউ, বাঁক কাঁধে মিস্ত্রী, সৈনিক, ট্রাফিক পুলিশ, রাধামাধব, একছাচের জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা এবং আরও কত্ত রকম। এই সবই কিনতাম আমরা ঝুলন সাজাবো বলে। এখনকার দিনের পুতুলের মত ফিনিশ ছিল না হয়ত, কিন্তু সেগুলো বানানো হত পরম যত্নে এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই।
কিছু পুতুল আসতো ঘুরনি থেকে। অসম্ভব সুন্দর। তাদের মধ্যে ঘাড় নাড়া বুড়োবুড়ি খুব বিখ্যাত ছিল। সব বাড়িতেই খুজলে একটা না একটা পাওয়া যেত। আর বিক্রি হত বিভিন্ন মহাপুরুষ দের পুতুল। তার মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় ছিলেন নেতাজী। তার পরে রবিঠাকুর, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ এনাদের পুতুল। এখন মেলায় এসব আর দেখা যায় না খুব একটা। এখন সব চাইনিজ পুতুলের রমরমা। ব্যাটারি চালিত।
আমাদের ছেলেবেলায়, রথের দড়ি টানার থেকে পুতুল কেনার আগ্রহ ছিল ঢের বেশি। কারন একটাই ঝুলন।
ঝুলনের আগে থেকে কাঠের গুড়ো জোগার করা, তাতে বিভিন্ন রং করা, কোনোটা সবুজ (মাঠের রঙ) , কোনোটা কালো (রাস্তার জন্য)। বালিও আনা হত রাস্তা বানানোর জন্য।
জোগাড় করা হত পুরানো কাপড়, ভাঙা ঈট পাহাড় বানানোর জন্য। পুরানো কাপড়ে মাটি লেপে ঈটের উপর চাপিয়ে পাহাড় বানানো হত। তার ফাঁকেফাঁকে লাগানো হত কামিনি গাছের ডাল পালা। আর তার ফাঁকে লুকিয়ে থাকতো প্লাস্টিক এর সৈনিক। সকলের হাতেই থাকত আগ্নেয়াস্ত্র। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বা শুয়ে।
পাহাড়ের সামনে বানানো হত গ্রাম, খেলার মাঠ, ইস্কুল, রাস্তা, হাসপাতাল। গ্রামের মোড়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ। আর গ্রামের এক কোনে গাছের নিচে স্থান হত রাধামাধবের। সব পরিকল্পনাটাই নির্ভর করত কার কাছে কেমন ধরনের পুতুল আছে তার ওপর আর নিজের নিজের সাজানোর দক্ষতার উপর।
বাড়ির বড়রা এই ঝুলন সাজানোতে খুব একটা সাহায্য করতেন না কখনো। যা সাজানো হত, সবটাই সাজাতাম আমরা নিজেরাই। শুধু রাতে যাতে সুন্দর লাগে দেখতে, তারজন্য আলোর ব্যবস্থা করে দিতেন বাড়ির বড়রা ছোট ছোট টুনি বালব দিয়ে।
এখন কাউকে আর দেখিনা ঝুলন সাজাতে। পুতুল কেনা তো অনেক দুরের কথা। আমার মনে হয় বিষয়টা কিন্তু দারুন ছিল। এখনকার ছোটরা মানসিকতায় অনেক অনেক বড় আমদের থেকে। তারা মাঠে না গিয়ে মোবাইলেই গেমস খেলে। আমরা নিত্য খেলাধুলো করা সত্যেও অনেক বড় বয়স অব্ধি জানতাম না ক্রিকেট, ফুটবলের বিভিন্ন পজিশন গুলোর নাম। এখনকার ছোটরা সব জানে।
বড্ড তাড়াতাড়ি পালটে গেলো সময়টা। পাল্টালাম আমরাও। চেষ্টা করে গেলাম আপ্রান পাল্টাতে। পারষ্পরিক সম্পর্ক এর গ্যাপ বাড়তে লাগল। আর আমরা জেনারেশন গ্যাপ কমাতে ছূটলাম। ঝুলন বিদায় নিল। বিদায় নিল মাটির পুতুল।
বিদায় নিল অনেক কিছু।
কোনটা পরে, কোনটা আগে। বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয়।
মাঝে মাঝে একলা লাগে।
~ সৌমিক মুখোপাধ্যায়
জুলাই ১৫, ২০১৮। রোববার।
No comments:
Post a Comment